রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিত হবে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারেজ, উপকৃত হবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষ
দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর পর আবারও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত “পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)” প্রকল্পটি আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩৩৪.৭৪ বিলিয়ন টাকা।
প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মূল ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস এবং দুটি ফিশ পাস।
এছাড়া ব্যারেজের মাধ্যমে প্রায় ২.৯ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সংরক্ষিত পানি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নদীতে সরবরাহ করা হবে।
নদীগুলো হলো— হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল এবং ইছামতি নদী। শুকনো মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করা হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকে পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী শুকিয়ে যায় এবং কৃষি, মৎস্য, নৌপথ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মাহমুদুল হোসেন খান বলেন, ফারাক্কার কারণে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিশূন্য হয়ে পড়েছে এবং তাপমাত্রাও বেড়েছে। পদ্মা ব্যারেজ নির্মিত হলে পানি সংরক্ষণ করে সারা বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে বড় পরিবর্তনের আশা
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২.৯ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া যাবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদন এবং ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন বাড়তে পারে।
পাশাপাশি সুন্দরবন অঞ্চলের লবণাক্ততা কমানো, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং নদীর নাব্যতা ধরে রাখতেও সহায়ক হবে এই প্রকল্প।
জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও থাকবে
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতায় ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এছাড়া পানি সরবরাহের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, পদ্মা ব্যারেজ নতুন কোনো প্রকল্প নয়। ১৯৬৪ সাল থেকেই এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল।
১৯৯৭ সালে প্রকল্পের স্থান নির্বাচন করা হয়। তবে রাজনৈতিক নানা কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল।
বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, ভবিষ্যতে পানির সংকট, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা আরও বাড়বে। তাই মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই ব্যারেজের বিকল্প নেই।
২০২৬ থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত চলবে কাজ
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালে শুরু হয়ে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত চলবে বলে জানা গেছে।
সরকার আশা করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে।



